You are here
Home > জাতীয় > যৌতুক না দেয়ায় বর্বর নির্যাতনের শিকার গৃহবধূ..

যৌতুক না দেয়ায় বর্বর নির্যাতনের শিকার গৃহবধূ..

Fallback Image

হাসপাতালের বিছানায় নিথর পড়ে আছেন হাবিবা খাতুন। নড়াচড়ার নেই কোনো শক্তি। পারছেন না কথা বলতেও। একটু পরপর মা মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।
যৌতুক না দেয়ায় বর্বর নির্যাতনের শিকার গৃহবধূ হাবিবা খাতুন নওগাঁ সদর হাসপাতলে এখন মৃত্যুর প্রহর গুণছেন।

যৌতুক চেয়ে অমানবিক নির্যাতন করায় হাবিবার বাবা হাফিজুর রহমান বাদী হয়ে জামাতাসহ তিনজনকে আসামি করে নওগাঁ সদর থানায় একটি মামলা করেছেন।
মামলার পর হাবিবার স্বামী অভি ও তার শ্বশুর শামসুজ্জোহা খানকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ঘটনার পর থেকে শাশুড়ি সৈয়দা তাহমিনা পলাতক আছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, নওগাঁ শহরের দক্ষিণ হাট-নওগাঁ মহল্লার হাফিজুর রহমানের মেয়ে হাবিবা খাতুনের সঙ্গে একই মহল্লার শামসুজ্জোহা খান বিদ্যুতের ছেলে তামভি হাসান অভির প্রেমের সম্পর্ক ছিল।
হাবিবা নওগাঁ পিএম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগের ১০ম শ্রেণীর মেধাবী ছাত্রী। হাবিবা পঞ্চম শ্রেণীতে বৃত্তি, অষ্টম শ্রেণীতে জিপিএ-৫ এবং ২০১৫ সালে জেলা মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অর্জন করে। আর অভি উচ্চ মাধ্যমিকে পড়াশুনা করে।
গত বছরের ২৩ আগস্ট হাবিবা স্কুলে আসার নাম করে পালিয়ে গিয়ে কোর্ট ম্যারাজের মাধ্যমে অভিকে বিয়ে করেন। বিয়ে পড়ান কাজী রফিকুল ইসলাম।
হাবিবার পরিবারিক সূত্র জানায়, বিয়ের পর থেকে হাবিবা বাবার বাড়িতে যোগাযোগ রাখত না। কিন্তু বিয়ের তিন মাসের মাথায় হাবিবাকে বাবার বাড়ি থেকে দুই লাখ টাকা নিয়ে আসতে বলে অভির পরিবার। এত টাকা হাবিবার বাবা গৃহশিক্ষক হাফিজুর রহমানের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। এনিয়ে হাবিবাকে প্রায় নির্যাতন করত স্বামীর পরিবার।
গত ৩০ নভেম্বর বিকালে হাবিবার বাবার কাছে খবর পাঠানো হয় তার মেয়ে গলায় দড়ি দিয়ে মারা গেছেন। কিন্তু হাবিবার শ্বশুরের পরিবার ওইদিন হাবিবাকে নওগাঁ সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়।
সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক হাবিবা জীবিত আছেন জানিয়ে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করতে বলেন। এর চার দিন পর অচেতন হাবিবাকে হাসপাতাল থেকে গোপনে নিয়ে যায় তারা।
হাবিবাকে দেখতে তার পরিবার রাজশাহীতে গেলে হাসপাতালের দেয়া ঠিকানায় খুঁজে পাওয়া যায়নি।
পরে নওগাঁর স্থানীয় কমিশনার মজনু হোসেন ও ছেলের বাবা শামসুজ্জোহার শরণাপন্ন হন হাবিবার বাবা। তাদের সহযোগিতায় প্রায় ছয় দিন পর রাজশাহীতে অভির এক আত্মীয়ের বাসায় অচেতন হাবিবাকে পাওয়া যায়। বাবা হাফিজুর রহমান হাবিবাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, নির্যাতনের শিকার হাবিবার মাথার পেছনে ও কোমরে বড় ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া সামনের পাটির দুটি দাঁত ভাঙা আছে। খাবার দেয়া হচ্ছে নাক দিয়ে। কথা বলতে পারছেন না। শরীরের কোনো অংশই কাজ করছে না তার।
দীর্ঘ ১৬ দিন লাইফ সাপোর্টে রাখার পর তাকে চিকিৎসকরা হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তির পরামর্শ দেন। সেখানে তিন দিন থাকার পর বাড়ি নিয়ে যেতে বলেন চিকিৎসকরা। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি আবার নওগাঁ সদর হাসপাতালে হাবিবাকে ভর্তি করা হয়।
হাবিবার বাবা হাফিজুর রহমান বলেন, মেয়ের শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ। নাকে নল দিয়ে খাওয়াতে হচ্ছে। হাত পায়ে কোনো শক্তি নেই। কথাও বলতে পারে না। শুধু মাঝে-মধ্যে চেয়ে চেয়ে দেখে।
মেয়ের এমন অবস্থার জন্য যারা দায়ী তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান তিনি।
হাবিবার মা সফুরা আখতার বলেন, ’যৌতুকের জন্য আমার মেয়েকে বিভিন্নভাবে শারীরিক নির্যাতন করেছে ছেলের পরিবার। রাজশাহীতে নেয়ার পর থেকেই মোবাইলে ছেলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয় হাবিবা সুস্থ আছে। কিন্তু মিথ্যা সান্ত্বনা দিয়ে দিনের পর দিন চিকিৎসা না করে তারা আমার মেয়েকে মেরে ফেলতে চেয়েছে।’
তিনি বলেন, ’উন্নত চিকিৎসা করানোর মতো সামর্থ নেই আমাদের। এখন কী করা উচিত ঠিক তা বুঝে উঠতে পারছি না।’
নওগাঁ সদর হাসপাতালের অর্থপেডিক সার্জারি ডা. আরশাদ হোসেন বলেন, ’খুবই গুরতর অবস্থা। এই হাসপাতালে এ রোগীর চিকিৎসা সম্ভব নয়।’
তিনি বলেন, ’রোগীর যে অবস্থা তাতে মেডিকেল কলেজ অথবা নিউরোলজি সেবা দেয়া হয় এমন হাসপাতালে নেয়া হলে খুবই ভালো হয়। সাময়িকভাবে এখানে তাকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব তার উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।’
কাজী রফিকুল ইসলাম বলেন, ’এটি ছিল কোর্ট এলাকার বিয়ে। জন্মসনদের কাগজপত্র দেখে উভয়ের মতামতে বিয়েটি পড়ানো হয়। কাগজটি আসল না নকল তা যাচাই করার প্রয়োজন হয়নি।’
নওগাঁ সদর থানার ওসি তরিকুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় তিনজনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। মামলার পর অভিযুক্ত অভি ও তার বাবা শামসুজ্জোহা খানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অভির মা সৈয়দা তাহমিনাকে গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত আছে।’

Similar Articles

Leave a Reply

Top