You are here
Home > জাতীয় > আজকের দিনেই প্রথম জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হয়

আজকের দিনেই প্রথম জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হয়

মার্চ মাসে মেঘমুক্ত নীল আকাশ। ঝকঝকে রোদ। এরই মাঝে বাতাসে আন্দোলিত হচ্ছে লাল-সবুজ পতাকা। আমাদের অতিপ্রিয় জাতীয় পতাকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে প্রথম এই পতাকা উত্তোলিত হয় ১৯৭১ সালের ২ মার্চ।

বাঙালির স্বাধীনতার দাবি এবং স্বাধিকার চেতনা একদিনে বিকশিত হয়নি। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়। দুশ বছরের শোষণ ও নিপীড়ন শেষে ইংরেজরা ত্যাগ করে উপমহাদেশ। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পরও পূর্ববাংলার জনগণ তাদের কাক্সিক্ষত স্বাধীনতার স্বাদ পায়নি। বরং প্রতি পদে পদে তার পায়ে পরানো হয় শোষণের জিঞ্জির।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের পর বাঙালি বুঝতে পারে। পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে যেমন ভৌগোলিক দূরত্ব বিস্তর, তেমনি পাকিস্তানের দুই অংশের অধিবাসীদের মধ্যে মানসিক দূরত্বও শত গুণে বেশি।

অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে বাঙালিকে শোষণ করাই যেন ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের মূল উদ্দেশ্য। ইংরেজ চলে গিয়ে যেন নতুন প্রভু পায় বাংলার মানুষ। ভূমি সংস্কার, রাষ্ট্রভাষা, অর্থনীতি, প্রশাসন, প্রতিরক্ষা সবদিক থেকেই যেন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছিল। তাই সংগত কারণেই বাঙালির মনে ক্রমেই বাড়ছিল স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা।

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টিতেই বাংলার জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে সমগ্র পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বৈধ দাবিদার হন। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক শাসক এবং বেসামরিক রাজনৈতিক নেতারা কোনোভাবেই আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চায়নি।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলি ভুট্টো দম্ভভরে ঘোষণা করেন যে, আসন্ন জাতীয় অধিবেশন পিছিয়ে দেওয়া হোক। পিপিপির উপস্থিতি ছাড়া সংসদ অধিবেশন হলে পশ্চিম পাকিস্তানে ভয়াবহ আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। তার মানে বাঙালিকে তার ন্যায্য অধিকার দেওয়া চলবে না। বরং পেশোয়ার থেকে করাচি পর্যন্ত জীবনযাত্রা অচল করে দেওয়ার হুমকিও দেন ভুট্টো। এসব কারণে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল সমগ্র পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরও পূর্ববাংলার জননেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে কিছুতেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বৈধ পদ ছাড়তে রাজি নয় অবাঙালিরা।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান ভাষণে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। কারফিউ জারি করা হয় দেশে। এই ঘোষণার প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু পূর্ববাংলার জনগণের ন্যায্য দাবি আদায়ে সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেন। ঢাকাসহ পূর্ববাংলা মুখরিত হয় স্লোগান ও মিছিলে। ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’ এমন স্লোগানে মুখরিত হয় পূর্ববাংলা। ঢাকা পরিণত হয় মিছিলের নগরীতে। ছাত্র-জনতা বুঝতে পারে পূর্ববাংলাকে স্বাধীন না করতে পারলে পশ্চিম পাকিস্তানিদের এই শোষণের নিগড় থেকে রেহাই নেই। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ ছাত্রলীগ ও ডাকসুর উদ্যোগে বিশাল ছাত্র গণজমায়েত হয়। গুলিস্তানে বামপন্থিদের উদ্যোগে বিশাল জনসভা হয়। এদিকে সামরিক শাসক পূর্বপাকিস্তানে সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত জারি করে কারফিউ। কিন্তু কারফিউ ভেঙে বেরিয়ে আসে মানুষ।

২ মার্চ ঢাকায় হরতাল পালিত হয়। ঢাকা বিমানবন্দরে সামরিক বাহিনীর গুলিতে দুই বাঙালি নিহত হন। এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন চত্বরে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের এক ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। তখন ডাকসুর সহসভাপতি ছিলেন আসম আবদুর রব। তিনি এবং অন্য ছাত্রনেতারা কলাভবন চত্বরে প্রথমবারের মতো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতীক লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়ে দেন বাংলার নীল আকাশে। পরদিন ছাত্রলীগ আয়োজিত পল্টনের জনসভায় বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ স্বাধীন বাংলাদেশের ইশতেহার পাঠ করেন। সেদিনও স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়ানো হয়। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন নূরে আলম সিদ্দিকী।

বঙ্গবন্ধু নিজের হাতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়ান ২৩ মার্চ। বিদেশের মাটিতে প্রথম বাংলাদেশের পতাকা ওড়ে ১৯৭১ সালের ১৮ এপ্রিল ভারতের কলকাতায় বাংলাদেশ মিশনে। ১৯৭০ সালের ৬ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে ছাত্রনেতা আসম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজ, কাজী আরেফ আহমেদ, মার্শাল মনিরুল ইসলাম, স্বপন কুমার চৌধুরী, নজরুল ইসলাম, শিবনারায়ণ দাশ, হাসানুল হক ইনু, ইউসুফ সালাহউদ্দীন আহমেদ প্রমুখ প্রথম বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা তৈরির পরিকল্পনা করেন।

১৯৭১ সালের অগ্নিঝরা মার্চে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়ানোর পর বাংলার স্বাধীনতা হয়ে পড়ে সময়ের দাবি। পূর্ববাংলায় চলতে থাকে মিছিল ও ধর্মঘট। চট্টগ্রামে দেখা দেয় বাঙালি-বিহারি সংঘর্ষ। অবাঙালি উর্দুভাষী বিহারিরা সব সময়ই ছিল বাঙালিদের চরম বিরোধী। তারা পশ্চিম পাকিস্তানের কট্টর সমর্থক ছিল। বিহারি-বাঙালি দাঙ্গা ছড়াতে থাকে। আর পূর্ববাংলার সাধারণ মানুষ মনেপ্রাণে প্রস্তুত হতে থাকে পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য।

Similar Articles

Leave a Reply

Top