You are here
Home > জেলার খবর > ঢাকা > ঢাকা প্রতিবন্ধীদের জন্য নয় এ শহর!

ঢাকা প্রতিবন্ধীদের জন্য নয় এ শহর!

banglanewsone
 

বিশ্বের অন্যতম জনবহুল শহর ঢাকা। দিনদিন এ শহরের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাড়তি জনসংখ্যার জন্য প্রয়োজন অতিরিক্ত যানবাহন। কিন্তু বাড়ছে না সড়কের দৈর্ঘ-প্রস্থ। অন্যদিকে বাড়তি জনসংখ্যার জীবিকার তাগিদে ফুটপাত চলে গেছে হকারদের দখলে। ফলে রাজধানীতে স্বাভাবিক মানুষদের চলাচলেই পোহাতে হচ্ছে নানা ভোগান্তি। তবে সবচেয়ে বেশি বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন প্রতিবন্ধীরা। ফুটপাত বেদখল হওয়া, রাস্তা খোঁড়াখুড়ি, সড়ক মেরামত ও ম্যানহোলের ঢাকনা খোলা রাখার মতো অসচেতনমূলক কর্মকাণ্ড রাজধানীতে প্রতিবন্ধীদের চলাচলের প্রধান প্রতিবন্ধকতা।

সবচেয়ে বেশী সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ও হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের। তাদের জন্য রাজধানীতে চলাচল যথারীতি যুদ্ধের সামিল। ফুটপাত বেদখল থাকায় প্রধান সড়কে জীবনের ঝুকি নিয়ে চলতে হয় যানবাহনের সাথে। তাছাড়া মহানগরীর ফুটপাত, ওভারব্রিজ, জেব্রা ক্রসিং, আন্ডারপাস, গণপরিবহন ও বাস স্টপেজ কোনটাই প্রতিবন্ধীদের চলাচলের উপযোগী নয়।

প্রতিবন্ধীদের অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ অনুযায়ী ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কোন প্রকার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বৈষম্য ব্যাতিরেকে সার্বজনীন মানবাধিকারসহ ভৌত অবকাঠামো, যানবাহন এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে প্রবেশগম্যতা, স্বাধীনভাবে জীবনযাপন এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পূর্ণ ও কার্যকরভাবে অংশগ্রহণ করবে।’ কিন্তু বাস, ট্রেন, স্টিমারসহ দেশের কোন প্রকার যানবাহনে স্বাচ্ছন্দভাবে প্রতিবন্ধীদের প্রবেশের জন্য বিশেষ কোন ব্যবস্থা নেই। ফুটপাথের মাথাগুলো হুইলচেয়ার প্রবেশের জন্য ঢালু করে রাস্তার সাথে মিশিয়ে রাখার নিয়ম থাকলেও খুব কম স্থানেই তা দেখা যায়। যেখানে ফুটপাতের মাথা ঢালু করা হয়েছে সেখানে আবার মটরসাইকেল প্রবেশ ফেরাতে লোহার থাম বা বোল্ট দেওয়া হয়েছে। ফলে ফুটপাথের মাথা ঢালু থাকলেও তা ব্যবহার করতে পারছে না হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীরা।

 

স্বাভাবিক মানুষদের সহযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গির অভাবকে দ্বায়ী করে প্রতিবন্ধীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ভাস্কর ভট্টাচার্য বলেন, মধ্য আয়ের দেশ হতে গিয়ে আজ কারো হাতে সময় নেই। কেউ একজন অন্ধকে হাত ধরে রাস্তা পার করার সময় পায় না। কোন প্রতিবন্ধী ম্যানহলে পড়ে থাকলেও তাকে তোলার সময় পায় না। সাধারণ মৌলিক অধিকারগুলোর সাথে প্রতিবন্ধীদের অবাদ ও মুক্তভাবে চলা ও সব জায়গায় প্রবেশের অধিকারও প্রধান একটি চাহিদা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অটিজম দিবস আসলে প্রধানমন্ত্রী সুন্দর সুন্দর কথা বলে, কিন্তু পরে আর কোন খোঁজ নেয় না। যেখানে দেশের উন্নয়নের জন্য এত প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে সেখান প্রতিবন্ধীদের জন্য সরকার কেন উদ্যোগ নিচ্ছে না?

২০০৮ সালের বিল্ডিং কোড অনুযায়ী প্রতিটি গণস্থাপনায় প্রতিবন্ধীদের জন্য র‌্যাম্প (ঢালু রাস্তা) ও টয়লেট থাকার কথা। কিন্তু খুব কম গণস্থাপনায়ই প্রতিবন্ধীদের প্রবেশের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা আছে। উইম্যান উইথ ডিজ্যাবিলিটিজ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আশরাফুন নাহার মিষ্টি বলেন, বিল্ডিং কোড অনুযায়ী সব সরকারি ও বেসরকারি প্রকিষ্ঠানে প্রতিবন্ধীদের প্রবেশের জন্য র‌্যাম্প থাকার কথা থাকলেও হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে এ ব্যবস্থা আছে। এলজিইডি ভবনের দুই নাম্বার বিল্ডিং ও ঢাকার পাসপোর্ট অফিসের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কিছু প্রতিষ্ঠানে আবার র‌্যাম্প থাকলেও তা অতিরিক্ত খাড়া হওয়ায় হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের পক্ষ্যে ব্যবহার উপযোগী না।

প্রতিবন্ধীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা এ হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী আরো বলেন, বাংলাদেশের কোন গণপরিবহন ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ কোন ব্যবস্থা নেই। ফলে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা গণপরিবহনে যাতায়াতের ক্ষেত্রে চরম দুর্ভোগের শিকার হন। তাছাড়া গণপরিবহনে নারী ও শিশুদের সাথে প্রতিবন্ধীদের জন্য নির্দিষ্ট আসন রাখা হয়। ফলে আসন খালি না থাকলে অনেক সময় প্রতিবন্ধীরা এসব আসনে বসতে পারে না। তাই তিনি প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা আসনের ব্যবস্থা করার দাবি জানান।

অতিরিক্ত কোন বাজেট ছাড়াই উন্নত বিশ্বের মতো দেশের গণপরিবহনে প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়া সম্ভব উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধুমাত্র দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও সরকারের স্বদিচ্ছা থাকলে গণস্থাপনা ও গণপরিবহন প্রতিবন্ধীদের ব্যবহার উপযোগি করা সম্ভব।

 

প্রতিবন্ধীদের চলার অন্যতম প্রধান কিছু সমস্যা হলো- পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ছাড়া নির্মাণ কাজ করা, রাস্তা খোঁড়াখুড়ি, সড়ক মেরামত ও ম্যানহোলের ঢাকনা খোলা রাখা। ম্যানহলের ঢাকনা খোলা থাকার কারণে গত ৬ মার্চ রাজধানীর পল্টন এলাকায় ঢাকনাবিহীন ম্যানহোলে পড়ে সানু মিয়া (৫৫) নামে এক দৃষ্টি প্রতিবন্ধীর মৃত্যু হয়। অভিযোগ উঠেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অবহেলার কারণে এই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটছে। এর আগেও রাজধানীতে বিভিন্ন সময় দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন প্রতিবন্ধীরা।

প্রতিবন্ধী নারীদের নেতৃত্বে পরিচালিত তিনটি সংগঠন সানু মিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটি মিলনায়তনে “প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অনাকাঙ্খিত মৃত্যু এব্ং মানবাধিকার লঙ্ঘন”শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। সংবাদ সম্মেলন থেকে প্রতিবন্ধীদের অধিকার রক্ষা ও সব স্থানে প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করতে সরকারের কাছে কিছু দাবি জানানো হয়।

দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে:

১. নগরীর কোথাও ম্যানহলের ঢাকনা উন্মুক্ত না রাখা।

২. ফুটপাথ, ওভার ব্রীজ, জেব্রাক্রসিং, আন্ডারপাস, গণপরিবহন ও বাস স্টপেজ প্রতিবন্ধীদের পূর্ণ ব্যবহার উপযোগী করা।

৩. ফুটপাথে একটি হুইলচেয়ার ও একটি সাইকেল পাশাপাশি চলার মত প্রশস্ত ও ক্লিয়ার স্পেস নিশ্চিত করা।

৪. ফুটপাথে টেলিফোনের তারের বাক্স, লাইটপোস্ট, ট্রাফিক পুলিশের স্টেশন ইত্যাদি না রাখা।

৫. কনস্ট্রাকশনের জন্য উন্মুক্ত স্থান ব্যবহার না করা ও রাস্তা পারাপার, ওভারব্রীজ এবং আন্ডারপাসের জন্য ব্রেইল গাইড ব্লক, অডিও সাউন্ড সিস্টেম ও দৃশ্যমান চিহ্ন স্থাপন কারা।

বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র মতে, এ জনসংখ্যার ১০ ভাগ তথা প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ বিভিন্ন প্রতিবন্ধিতার শিকার। কিন্তু ২০০১ সালের আদম শুমারি অনুযায়ী আমাদের দেশের প্রতিবন্ধী হচ্ছে জনসংখ্যার ১.৬ ভাগ অর্থাৎ ১ লাখ ৬০ হাজার। বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতি (বিপিকেএস) এর মতে ৭.৮ ভাগ, অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের মতে, ৮.৮ ভাগ এবং জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামের মতে ৫.৬ ভাগ। তবে দি সোসাইটি টু হেলপ এডুকেশন ইন বাংলাদেশ ইন্টারন্যশনাল অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ১৬ লাখ বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছে।

Similar Articles

Leave a Reply

Top